নিহারিকার নিরব দর্শন
নাসিমা খান
চাঁদ জ্যোৎস্নায় একেবারে হাডুডাবু খাচ্ছিলো বিন্দু বাবু । সঙ্গে চমক মার্কা শাড়ী পরণে নিতুর । শরীর দিয়ে এক ধরণের বিদ্যুৎ ছটা জ্যোতি আলোকিত করে রেখেছে বিন্দু বাবুকে । জ্যোৎস্নার যত টূকু না নিতুকে গিলেছে তার বেশি গিলেছে বিন্দু বাবুর দুচোখ । ঝমক ঠমকে চোখের বক্র চাহণিতে খতম হয়ে যাচ্ছিলো বন্দুর রসিক দিল ।আকুপাকু করছিলো নিতুর হাতটি ধরার জন্য । কড়া নিষেধ করে দিয়েছে নিতু,- খবরদার বাবু, সীমা অতিক্রম করো না, আমি অন্যের বউ !
বিন্দু বাবুর মনের ্ভিতর তখন আগ্নেয়গিরির মত অগ্ন্যুতপাতের অপেক্ষা মাত্র । এই রমনী দোলায়িত দেহ পল্লবে তার হৃদয়ের তারে সুরের লহরী বেজে বেজে ফিরছে আকাশের সীমানা পেরিয়ে মাটির অতল পর্যন্ত । বজ্রের নিনাদ আর কতো জোরে ঘোষিত হতে পারে, তার হৃদয়ের ঘোষণা তার থেকে আরো জোরে ঘোষিত হচ্ছে । আজ তোমাকে ছাড়বো না, যতই ছল চাতুরী করো, ছলাকলায় ভুলার মতো মন আর আজ বিন্দু বাবুর নেই । ছিড়ে গেছে শরীরের সমস্ত তার । এখন ফিনকি দিয়ে কেবল অস্থির বাসনা হুল্লোড় তুলেছে সাগরেরর উনমত্ততার মত ।
জোর করে টেনে নিলো নিজের কাছে,- পালাতে পারবে না আজ । এতো রাতে ঘুম না হওয়ার অজুহাতে ছাদে উঠে আসার অর্থ শুধু পায়চারী আর চাঁদ দর্শন নয়, তুমি এই বিন্দুকেও চেয়েছিলে ।
নিতু জোর করে ছাড়িয়ে নিয়ে বললো,- খোলা আকশ সাক্ষী আমি দেখতে চেয়েছি, গিলতে চেয়েছি চাঁদের রূপালী রস, কিন্তু চাঁদকে পেতে যাবার মতো বুদ্ধিহীন আমাকে ভেবো না, আজ রাতে চাঁদ দর্শন মাথায় তুলে রাখলাম । আমার বড্ড ঘুম পেয়েছে চললাম ।
ঝরা আর শুকনো পল্লবের মতো হতাশা বিন্দু বাবুকে ঘিরে ধরলো । মর্মাহত হয়ে ছাদের উপর রাখা চেয়ারে বসে পড়লো । সে এখন একা । রমনীদের চিনতে যাবার বৃথা চেষ্টা সে করে না। নিত্তু কত না ঠারে ঠোরে বুঝিয়েছে তাকে পেলে ধন্য হতো তার জীবন । এক কাপ চা বানিয়ে খাওয়াতে পারলে মনের জানলা দিয়ে ফুর ফুরে গোলাপের শোভা আর সুবাস বেরুতে পারবে । দু একবার গায়ে গায়ে ইচ্ছে করে ধাক্কাও লাগিয়েছে । সাহস না দিলে কী সে আজ ওভাবে নিজেকে সমার্পণ করতে পারতো । লজ্জাও তাকে পেয়ে বসলো । ছিঃ ছিঃ কাল সে কীভাবে মুখ দর্শন করাবে । নিতু যদি এক দলা থু মেরে দেয় তাতেও আশ্চার্য হবার কিছু নয় । দ্রুত সিঁড়ি দিয়ে নেমে ঘরে ঢুকলো সে। নিহারিকা বেঘোরে ঘুমুচ্ছে । বিয়ের রাত থেকেই বুঝেছে নিহারিকা তার নয় । সারাক্ষণ নিজের জগতেই হাবুডাবু খাচ্ছে । সাত প্রশ্নে এক জবাব দেয় । নিহারিকা নিহারিকা বলে বত্রিশবার ডাকলে সামনে এসে বলবে,- ডাকছিলে কেনো বলো ।
বিন্দু কাছে ডাকলে অবাক হয়ে প্রশ্ন করবে কেনো ? শুধু শুধু তোমার পাশে বসে থাকার মানে কী ? তোমার প্রয়োজন হলে বলো আসবো ।
মুখ ফুটে কখনও নিহারিকা বলেনি ভালোবাসি । অথচ স্বামী স্ত্রীর মাঝে এই একটি কথার প্রয়োজনীয়তা চাঁদ সূর্যের মতো কঠিণ সত্য । নিহারিকা এসব বোঝে না, নাকী বুঝেও অমন নিরশ বোধে বিভোর থাকে কীনা বিন্দুর জ্বানা নেই ।
চা, হবে এক কাপ ?
নিহারিকা হয়তো এক ঘন্টা পর এক কাপ চা নিয়ে সামনে দাঁরাবে । ভাবখানা এই খেলে খাও না খেলে গোল্লায় যাও ।
বিন্দু অবাক হয়ে তাকিয়ে বলবো,- যাও নিহারিকা এখন তৃষ্ণা নেই ।
নিহারিকা চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে চলে যাবে রান্না ঘরে । বোধ নেই , নাকী বোধহীনতার অভিনয় করে বিন্দু বাবুর জ্রবানা নেই । সে যে পর স্ত্রীকে জোর করে জড়িয়ে ধরে এসেছে নিতু জানেও না, ঘুমের অতলে পড়ে আছে আর জানলেও যে খুব বেশি প্রতিক্রিয়া হবে কীনা বিন্দুর সন্দেহ আছে । হায়রে জীবন তার । সারা জীবন কল্পনায় দেখেছে উড়ন্ত এক উর্বশী, সারাআক্ষণ দুরান্তপনায় ভরে রাখবে তাকে । তার সাথে লুডু খেলবে, গোল্লা ছুট খেলবে। চাদনী রাতে ছাছনার বিলে দৌড় প্রতিযোগিতা দেবে , কিন্তু এই নিরশ দেবী, মানুষ না মাটির মূর্তী বিন্দু বুঝতে পারে না । বিন্দু ভেবেছিলো সকাল হলেই নিতুর হাসবেন্ড চলে আসবে শুনতে কিন্তু কিছুই হলো না । সকালে উঠে চুল ঝাঁড়ছে বারানাদায় দাঁড়িয়ে নিতু । মুখে কোনো ভাবান্তর নেই । নারীতে যে কত রূপ বিন্দু জানে না । সে উঠোনে নেমে একটি বেলী ফুল তুলে ছুড়ে মারলো নিতুর গায়ে । নিতু উদাসিনতায় একবার দেখলো ফুলটি তার পায়ের কাছে দলা পাকিয়ে পড়লো । হয়তো একটি পাঁপড়ি ঝরেও পড়লো । দোতলার বারান্দায় কাপড় নাড়তে এসে এই দৃশ্য নিহারিকাও দেখলো । বিন্দু সেদিকে একবার তাকালো তারপর হাটতে হাঁটতে চায়ের দোকানে গিয়ে বসলো । রনবী বললো,- আজ স্যারের কলেজ নেই ? বিন্দু তখন নিতুকে ভাবছিলো। চুল ঝাড়ার সময় নিতুর শরিরের লতার মতো দুলুনী উপভোগ করছিল ।রমনীর সেদিকে বিন্দু মাত্র আগ্রহ ছিলো না । অথচ আশ্চার্য এই রমনী রাতে চাঁদের নির্যাস গিলতে ছাদে ওঠে । নিরবে কারো বাহু বন্ধনে আবদ্ধ হলেও তা থাকে মৃত চাঁদের মতো ফ্যকাশে ।
রনবী চা বানাতে বানাতে আকষ্মিক দেখলো,- নিহারিকা একটি তাতের শাড়ি পরণে, পিঠের উপর বড় একটি বেণী সাপের মতো নাচিয়ে বড় একটি সুটকেস হাতে রিক্সা ডাকছে । অবাক হয়ে বললো,- এতো সকালে ভাবী বুঝি বাবার বাড়ী দর্শনে যায় ?
বিন্দু বাবু অবাক হয়ে দেখলো। তারপর কান্ডজ্ঞান শূন্যের মতো চিৎকার চিৎকার করতে করতে ছুটলো , নিহারিকা, নিহারিকা কোথায় যাচ্ছো ?
নিহারিকা হাঁপাতে হাঁপাতে ছুটে আসা বিন্দুর দিকে তাকিয়ে বললো,- ফুল যারা দুপায়ে দলে যায়, তাদের পায়ের নিকট পুজোর ফুল গড়া গড়ি খায়, রাত্রে চাঁদের নির্জাসের লোভে যে আত্মা ঘুমন্ত স্ত্রীকে দরজা াগলা রেখে ছুটে যেতে পারে, তার বিপদের কথা চিন্তাও করে না, তার কাছে থাকবার দুঃসাহস আমার নেই ।
বিন্দু বাবু এতো দিনে যে নারীটিকে খুঁজে পেলো, সেই নাকী তারে ছেড়ে চলে যাচ্ছে , হাতটি জড়িয়ে ধরে বললো,- যাকে অনুভুতি শূন্য ভেবে মরিচিকার পিছনে ছুটেছিলাম, আজ তাকে চিনতে পেরেছি, আমি তাকে যেতে দিতে পারি না, নিহারিকা ।
নিহারিকা সজোরে হাত ছাড়্যে রিক্সায় উঠে বসতে বসতে বললো, সিনক্রিয়েট করে, পাড়ার লোককে জাগিয়ে তুলো না । আমি এই ধরণের নপুংসক স্বামীর কাছে আর কখনও ফিরে আসবো না । চল্ললাম ।
বিন্দু বাবু নিজেকে আর বেহায়া করার দূঃসাহস না দেখিয়ে , স্তম্ভীত হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো।

Comments