মধূচন্দ্রিমা
রেশমিন খাতুন
সন্ধ্যাবেলা সমস্থ কাজ সাতটার মধ্যেই সেরে ফেলার চেষ্টা করে শ্রবণা। সাতটার সময়ে শুরু হয়ে যায় তার প্রিয় সিরিয়াল "নীল পৃথিবী"। সারাদিন সে এই সিরি forয়ালটা দেখার জন্য অপেক্ষা করে। সকাল দশটা নাগাদ একবার রিপিট টেলিকাস্ট হয়। কিন্তু এখন একদম সময় হয় না তার। কোনোদিন যদি এক পর্ব দেখা না হয়ে ওঠে, তার আফসোস সব থেকে দামী শাড়িটা ছিড়ে যাওয়ার আফসোসের থেকে কোনোও অংশে কম।হয় না।
অবশেষে হানিমুনে যাওয়া হয়েছে দোলন আর সাগরের। তার আগে যা ঝগড়া হচ্ছিল, মনে হচ্ছিল তাদের বোধহয় আর হানিমুনে যাওয়া হয়েই উঠবে না। দুই পাশে বন, পাহাড়ী আঁকাবাঁকা রাস্তায় গাড়িটি হারিয়ে যাচ্ছিল প্রায়ই। অবশেষে রিসর্টে এসে পৌঁছালো তারা। সাগর হাত বাড়িয়ে দোলন কে নামতে সাহায্য করতে চায়। কিন্তু দোলন তার হাতে হাত দেয় না।
" বাইরেটা এত অগোছালো হিয়ে আছে আর বসে বসে টিভি গিলছো?"
সজলের কর্কশ আওয়াজ শ্রবণার ভালো লাগার রেশটা মুছে দেয়।
"গোছাচ্ছি। ওত চ্যাঁচাচ্ছো কেন?'
"চ্যাঁচাবো না তো কী করব? এখানে গ্লাস, ওখানে বই, জামাকাপড় গুলো কী অবস্থা! জানোনা এসব আমি পছন্দ করি না?"
" তুমিও গোছাতে পারো" বলতে গিয়েও বলে না শ্রবণা।
"ওঠো, এক কাপ চা দাও"
বিরক্ত মুখে টিভির সামনে থেকে উঠে আসে শ্রবণা। ফ্লাস্ক খুলে দেখে চা নেই। আবার চা বসাতে হবে। ওদিকে সাগর আর দোলন রিসর্টে পৌঁছে কী করছে কে জানে। চায়ের কাপ হাতে টিভির সামনে এসে দেখে সজল টিভির চ্যানেল পালটে খেলা দেখতে ব্যস্ত। রাগে ফেটে পড়তে চাইলো সে।
কিন্তু কতবার সে পেরেছে?
নীল কালোয় মেশানো একটা শাড়ি পরে সমুদ্রের ধারে দাঁড়িয়ে আছে দোলন।হাওয়ায় তার চুলগুলো উড়ছে। সাগর সদ্য বিবাহিতা স্ত্রীর মনোরঞ্জন করার কত চেষ্টা করছে। কিন্তু দোলন নির্বিকা। আসলে তার ইচ্ছের বিরুদ্ধে বিয়েটা হয়েছে তো, তাই। আইসক্রিম খাচ্ছে দোলন, মুগ্ধচোখে তাকিয়ে আছে সাগর। সেই মুগ্ধতা শ্রবণার চোখেও ছড়ায়।
তারাও বিয়ের পর এরকমই এক সমুদ্রের ধারে বেড়াতে গেছিল। সজলের তার প্রতি মুগ্ধতা তো দূরের কথা, উপদেশের ঠ্যালায় সে অস্থির হয়ে পড়েছিল। বাড়িতে কিভাবে চলতে হবে, কার সঙ্গে কিভাবে ব্যবহার করতে হবে, এসবই সে পাখিপটা করে পড়িয়েছিল শ্রবণা কে সেই কটা দিন।সংসার জীবনটা তার কাছে হঠাৎ বিভীষিকাময় মনে হয়েছিল। একমাসের বিবাহিত জীবনে অজস্র ত্রুটি বের করেছিল সজল। ওইসব বলার জন্যই বোধহয় সে তাকে বেড়াতে নিয়ে গিয়েছিল। এতদিনকার বিবাহিত জীবনে মনে পড়েনা সজল কোনোদিন তার জন্য কোনোও উপহার এনেছে কি না।
সাগর দোলনের জন্য একজোড়া নুপুর এনেছে। সামান্য হলেও দোলন খু্শি হয়। হয়তো এভাবেই দোলনের মনে জমা অভিমানের বরফ আস্তে আস্তে ভালোবাসার উষ্ণতায় গলে গিয়ে ওদের দুজনের মাঝের দুরুত্ব কমে আসবে খুব শিগিগির। সে জানে এসব পর্দাতেই হয়, তবুও...!
