Friday, October 11, 2019

Culture


অপলার পরিবৃত্ত 

সাবিনা ইয়াসমিন  


টিফিনের এই সময় টা খুব খারাপ কাটে অপলার। মেঘলা ভাত তরকারী সব সাজিয়ে বসেছে। শর্ষেবাটা মাছের গন্ধটা নাকে এসে লাগছে। বড়ি দিয়ে একটা সুক্তো, পোস্তর বড়া, করে মুগের ডাল আরোও কি একটা তরকারী। ছোটো কৌটোতে আচার ও আছে। অপলার নিজের খাবারটা বের করতে ইচ্ছে করছে না।শুকনো মুড়ি আর আলুভাজা, এই তার নিত্যদিনের খাবার। মাঝে মাঝে রুটি করে আনে, তবে  মেঘলার পঞ্চব্যঞ্জনের সামনে তাও স্বাদহীন হয়ে যায়। খেতে খেতে অনর্গল কথা বলা মেঘলার স্বভাব।  বাবা, মা, দিদি, দিদির ছেলে দুনিয়ার জ্ঞাতিগুষ্টি কী পরিমাণ ধনী ও রুচিশীল তারই ব্যাখ্যা শুনতে হয় অপলাকে। তারই মাঝে এটা সেটা খাবার তুলে দেয় অপলাকে। খাওয়ার পর হাল্কা প্রসাধন সারে। টানটান উজ্বল শ্যামবর্ণ ত্বক। সুন্দর হ্যান্ড ব্যাগ থেকে বেরোয় দামী প্রসাধনী।তার ছোঁয়ায় মেঘলাকে আরোও মোহময়ী লাগে। আজ সবুজ পাড়ের কমলা ধনেখালি শাড়ি পরে এসেছে। দামী ঘড়ি ব্র‍্যান্ডেড জুতো, সব কিছুতেই অপলার থেকে অনেক উঁচুতে। অপলা মেঘলার টান টান মেদ বিহীন শরীরের দিকে তাকায় একবার, আর একবার নিজের দিকে তাকায়। কে বলবে তারা সমবয়সী! মেদের আধিক্যে  বেঢপ চেহারায় সব পোষাকেই তাকে বেমানান লাগে। তার ফর্সা রঙে কোনোও জৌলুষ নেই, বরং মুখটা অসময়ের মেচেতাতে ছোপছোপ দাগে ভর্তি হয়ে গেছে। মেঘলার পুরুষ্টু বেণী কোমর ছাড়িয়েছে। সেদিকে ঈর্ষার দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে।ভিতরের এই জ্বালার ভাবটা চাপা দিতে পারেনা কিছুতেই।
অপলার স্বামীর ছোটো মুদির দোকান থেকে রোজগার পত্র খুব কমই হয়। প্রধানত অপলার আয়েই সংসার  চলে কোনোও রকমে। মাসের প্রথমেই  বাড়িভাড়া, দোকান ভাড়া বাবদ মোটা টাকা বেরিয়ে যায়। বাজার হাট, যাতায়াত খরচ, সবকিছুই তাকে ওই টাকার মধ্যেই  করতে হয়।  নিজের শখ আহ্লাদ, সাজগোজ  কবেই যেন শেষ হয়ে গেছে। তাই তিরিশ পার হতে না হতেই যেন সে বুড়িয়ে গেছে। মেঘলার সাজগোজ,  আচার আচরণ যেন সবে মাত্র কলেজ পার করেছে।
"করুক, আমার মত সংসার  বাচ্চা হোক, তারপর দেখব কেমন থাকে সাজগোজের বাহার, এমন পরিপাটি খাওয়াদাওয়া", মনে মনে গজরায় অপলা। মেঘলার রোজকার রুটিন জানে অপলা। দেরী করে ঘুম থেকে উঠে স্নান করে হেভি ব্রেকফাস্ট করে। মা টিফিনে খাবার সাজিয়ে রাখে, সেটাই নিয়ে চলে আসে। অপলার সারাদিনের ব্যস্ততা। সকালে ঘুম থেকে উঠেই খাবার জল ধরতে হয়। সারাদিনে আর পাম্প চালায় না বাড়ির মালিক। স্নান সেরে বাসি কাপড় কেচে, রান্না বসায়, ছেলেকে খাওয়ায়, স্কুলের জন্য রেডি করে। এটা সারতে ওটা গোছাতে গোছাতেই ঘড়ির কাঁটা হু হু করে ছোটে দশটার ঘরে। রোজকার যাতায়াতের জন্য সে কয়েকটা সিন্থেটিকের কমদামী শাড়ি কিনে রেখেছে। চট করে পরে ফেলতে পারে আর ইস্ত্রি করার ঝামেলাও নেই।
মেঘলা আজ পরে এসেছে সমুদ্র রঙয়ের একটা তাঁত কাপড়ের সরু সরু সোনালি জরি বসানো শাড়ি। অপলার চোখটা জ্বালা করে। বলে ওঠে,  "কী গো খুব তো সেজে গুজে এসেছো, তো কারুর মন রাঙাতে পারলে এখনও?"
"যার তার মন রাঙালে হবে? যোগ্য মানুষটাকে ঠিকঠাক খুঁজে পেতে হবে তো।"
অপলা ঠোঁটে হাসি ঝুলিয়ে মুখে বলে, "হ্যাঁ তা তো ঠিকই।"
কিন্তু মনে মনে বলে ওঠে, "পেতে পেতে আর তোর বিয়েই হবেনা। যতই কাজল মেখে, স্নো পাউডার মেখে খুকি সাজার চেষ্টা কর। বয়সটা তো আর কম হলোনা।
অপলা বলে ওঠে," বিয়েতে কিন্তু দারুণ খাওয়াতে হবে,  এই বলে রাখলাম।"
"হুম সে আর বলতে। বাবাকে বলে সব থেকে বড় লজটা বুক করাবো।"
 "সে নাহয় হবে, কিন্তু পাত্র  ঠিক হলো? সেই যে ইঞ্জিনিয়ার  ছেলেটার জন্য বলছিলে, সেটার কী হলো?"
"ওহ, সেই ছেলেটা? সেতো আমার থেকে বেঁটে। মানানসই হবে বলো? তাই বাদ দিয়ে দিয়েছি"
"তুমি বাদ দিয়েছো নাকি তারা বাদ দিয়েছে?"
"না না, আমিই বাদ দিয়েছি"
অপলা ফের মুখে হাসি রেখে মনে মনে বলে ওঠে, " যতই সেজেগুজে থাক,  আসলে তো কালো, তাই ওরাই তোকে বাদ দিয়েছে। তুই লুকোলে কী হবে, আমি বুঝিনা ভাবছিস?সাজগোকে বয়স একটু কম দেখালেও আমার থেকেও বড় হতে পারিস তুই। ভাগ্যিস মেঘনা অপলার মনের কথা গুলো পড়তে পারে না,
ছেলেটার খুব জ্বর তিন দিন থেকে। অপলা অফিস যেতে পারল না সে কদিন।নানা রকম টেস্ট, ওষুধ, ডাক্তারের ফি ইত্যাদিতে অনেক গুলো টাকা খরচ হয়ে গেল। মাঝের বাকি কটা দিন কিভাবে চলবে সেটা ভাবতেই অপলার মুখ ভার হয়ে গেল। প্রতিদিন বাসস্ট্যান্ডে আসার সময় বড় রাস্তার দুই পাশের দোকান  গুলোতে নজর ফিরিয়ে নিত্যনতুন ডিজাইনের জুতো, শাড়ি, ব্যাগ গুলোকে চেয়ে চেয়ে দেখা অপলার অভ্যাস। আজ  সেদিকে মন ছিল না একটুও। বিষন্ন চিন্তাগ্রস্ত মুখে বাসে ওঠে। অফিসে পৌঁছাতেই মেঘনা হইহই করে ওঠে, "উফ, কতদিন আসোনি অপলাদি, তোমাকে খবরটা দেওয়ার জন্য মনটা  ছটফট করছিল।"
 দিদি বলাটা অপলার ঘোর অপছন্দের। সমবয়সী যদি তাহলে আবার দিদি বলা কেন? কথাটা বলেও ছিল মেঘলা কে। উত্তরে মেঘলা বলেছিল, "তুমি তো আমার আগে জয়েন করেছো, সেই হিসেবে তুমি আমার সিনিয়র। তাই এটুকু সম্মান তো তোমাকে করতেই পারি অপলাদি"
 "সম্মান না হাতি,  নিজেকে কচি খুকি করে রাখার চেষ্টা করিস, তা ভালোই জানি" মনে মনেই গজরিয়েছিল অপলা।
"ফোন করেও খবর টা দিতে পারতে। আর তাছাড়া আমার বাড়ির ঠিকানা তো জানোই, বাড়ি আসতে পারতে একবার" ব্যাজার মুখে বলে ওঠে অপলা।
"এসব খবর আবার ফোনে বলা হয় নাকি?"
"তো কী খবর?"
"সেদিন একটা দারুণ সন্মন্ধ এসেছে জানো।  ছেলে ডাক্তার, নিজের বাড়ি গাড়ি সব  আছে।"
"দিয়ে, ঠিক হলো কিছু?"
"ওরা দেখে গেছে। আমাদের কে যেতে বলেছে।"
"দেখো কী  হয়।"
অপলার গলাটা ভীষন কাঠ কাঠ শোনালো।
সপ্তাহ খানেক পরে, অপলা জিজ্ঞেস করল, "কী গো, তোমার ডাক্তারের কী খবর? গিয়েছিলে?"
"হ্যাঁ, সবই ঠিক ছিল, কিন্তু ওরা বলেছে আমাকে চাকরিটা ছাড়তে হবে।  এটা সম্ভব বলো?"
একটু স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে অপলা। যাক, এখানে অন্তত বিয়েটা হচ্ছে না।  মাস তিনেক পর বিয়ের খবরটা নিয়ে আসে মেঘলা নিজেই। হবু বর,  শ্বশুরবাড়ির গুণকীর্তন শুনতে শুনতে অপলার কান ঝালাপালা।
অপলা থাকতে না পেরে বলে ওঠে, "দূর থেকে শর্ষে ফুল ঘনই লাগে, কাছে গিয়ে দেখো কী হয়"
অপলার  এই কথাটা মেঘলার একটু খারাপই লাগল। কিন্তু সে মুখে কিছু না বলে একটা ছোট্ট হাসি  উপহার দিলো।
নির্দিষ্ট দিনে খুব জাঁকজমক করে মেঘলার বিয়ে হলো। অনেক খুঁজেও অপলা কোনো দোষ ধরতে পারল না। মেঘলাকে আজ রাজরানীর মত লাগছে। গোটা শরীর থেকে সোনার দ্যুতি ঝড়ছে যেন। আজ ব দেখে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে খাওয়ার জায়গার দিকে হাঁটা দেয়। সত্যিই দারুণ খাইয়েছিল মেঘলার বিয়ে তে। 
বেশ কয়েকদিন অনুপস্থিতির পর মেঘলা অফিসে এসেছে। হাত ভর্তি গয়না আর সিঁদুর ওর সৌন্দর্য্য যেন আরোও অনেক গুণে বাড়িয়ে দিয়েছে। মেঘলার গল্প যেন শেষই হয়না সেদিন। গলা থেকে খুশি, উপচে পড়ছে আর গা থেকে সুখের দীপ্তি। মধুচন্দ্রিমায় যাওয়ার জন্য মেঘনা বেশ কয়েকদিনের ছুটি নিলো। অপলার দিন গুলো যেরকম ঘষটে ঘষটে পাংশু ভাবে কাটে, সেরকমই কাটতে লাগল। সন্ধ্যার সময় রান্না বসিয়ে প্রায় দিনই  মনটা উদাস  হয়ে যাচ্ছিল। কবে সে শেষ বেড়াতে গেছে, কবে যে দুটো শখের জিনিষ কিনতে পেরেছে ভাবতে গিয়েই দীর্ঘশ্বাস ফেলছিল বারবার। সেই গুনে গুনে মেপে মেপে চলা যেন দুর্বিষহ জীবন। এই যে রাত্তিরের আলু-পটলের তরকারী আর একটু পাতলা ডাল, ব্যস। একেবারে নির....। রোজকার একপোয়া দুধ নেয় ছেলেটার জন্য, সেটা গরম করতে উঠল।
মধুচন্দ্রিমা সেরে এসে মেঘলা জানালো অনেক কথা আছে। অপলা ভাবল, ফের বরের গুণকীর্তন, বেড়ানোর হাজারো বিবরণ শুনতে হবে এবার। তা হোক, তবে একয়েকদিন সত্যিই খুব ফাঁকা ফাঁকা লাগছিল তারও। কিছু একটা যেন নেই নেই। কিন্তু সব কিছু শোনার পর অপলার বুক থেকে একটা লম্বা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে,এবং সেটা যে দুঃখের নয়, তা বুঝতে  পারে ভালোই। মনে মনে  বলে ওঠে, "যাক এত দিনে মহারানীর পা মাটিতে পড়েছে। শ্বাশুড়ির নাক উঁচু স্বভাব,  ননদের  পায় ভারী,  জায়ের টিপ্পনি শুনে মাত্র দুই মাস শ্বশুরবাড়ি কাটিয়েই বুঝেছে কত ধানে কত চাল, হুহ"
অপলা অবশ্য ওকে এসব বুঝতে না দিয়ে স্বান্তনা দিয়েছে, ধীরে ধীরে সব ঠিক হয়ে যাবে। এবং বুঝিয়েছে, শ্বশুর বাড়িতে মেনে নেওয়া আর মানিয়ে নেওয়াটাই আসল। কিন্তু মেঘলা সেসব কানেই তোলেনি। কিন্তু কয়েকমাস যেতে না যেতেই মেঘলার সমস্যাটা বেশ জটিল আকার ধারণ করে। সমস্যাটা হচ্ছে ওর বর, সজলের সাথেই। সংসার কে সারাদিন  অবহেলা করে বাইরে থাকা, এটা নাকি তার এখন আর পছন্দ নয়। অথচ বিয়ের আগে এসব নিয়ে কথা বলে নিশ্চিত হয়েই বিয়েতে মত দিয়েছিল দুজনেই।
অপলা কয়েলদিন ধরে লক্ষ্য করছে, মেঘলার চিন্তান্বিত মুখ। এখন যেন অনেকটা সংযত, পরিণত।।সেই আগের উচ্ছল ভাবটা উধাও হয়ে গেছে একেবারেই। দেখতে  দেখতে পুজো এসে গেল। এই সময়টাতে অফিস বেশ কয়েকদিন ছুটি থাকে। ফলে ইচ্ছে মত একটু স্বস্তির শ্বাস ফেলতে পারে অপলা। মায়ের  বাড়ি গিয়ে সকলের সাথে সাক্ষাৎ করে আসে। ঠাকুর দেখতে যায় ছেলে কে নিয়ে। পুজোর সময়, স্বামী দোকানে ব্যস্ত একটু বেশি ,তাই সেভাবে বেরোতে পারে না যদিও। যেদিন ছুটি হবে সেদিন অপলা মেঘলাকে জিজ্ঞেস করল ,"কী গো, পুজোয় কোথায় যাচ্ছ? বিদেশ নাকি?"
ছোট্টো উত্তর এলো, "দেখা যাক কী হয়। "
পুজোয় একদিন কোনোও রকমে স্বামীকে রাজী করিয়ে দোকান বন্ধ করে পুজোর কেনাকাটা করল, সিনেমা দেখে এলো, ভালো কিছু খাওয়া দাওয়া করে বাড়ি ফিরল তিনজনেই।  ঘরে এসে বসতেই একটু পরই দরজায় বেলের আওয়াজ। দরজা খুলে দেখে বাইরে মেঘলাকে দেখে একটু অবাকই হলো।
"কী গো, তুমি? এসময়ে? এসো এসো  সব ভালো তো।" এই ডাকে অবশ্য এখন কোনোও ভণিতা ছিল না। প্রত্যুত্তরে মেঘনা শুকনো একটা হাসি দিল আর বলল," ভালো আছি? কি জানি।"
"তো এই পুজোর দিন, এমন সন্যাসীনির মত সাজ কেন? নুতন বিয়ে, কোথায় একটু জম্পেশ করে সেজে গুজে থাকবে, বরের হাত ধরে ঘুরতে বেরোবে, তা না, এমন মনমরা কেন বাপু?"
 মেঘনা এসব কানে নিলো না। ঘরের ভিতরে এসে চারিদিক দেখতে লাগল ঘুরে ঘুরে।সত্যিই মেঘলার শরীরে আজ তেমন কোনোও প্রসাধন ছিল না। খুব সাধারণ আটপৌড়ে শাড়ি পরনে, আর গয়নাগাটি কিছুই নেই।  যাকে বলে আভরণহীন।
"বাহ, অপলাদি, ঘরটা বেশ গুছিয়ে রেখেছো তো"
"কী যে বলো, এই একটাই তো ঘর আমাদের, তার আবার গুছানো।"
বিছানার  পাশে দুটো বেতের মোড়া ছিল, মেঘনা তারই একটা টেনে বসল আর ঘাড় ঘুরিয়ে দেখতে লাগল এদিক সেদিক। একধারে আলনায় পরিপাটি করে গোছানো কাপড়, আয়না বসানো আলমারী, কাঁচটা ঝকঝক করছে। একটা ক্যাবিনেটের উপরে টিভি, নীচের শোকেশের ভিতরে বেশ কিছু সৌখিন জিনিষ, অঞ্জনের খেলনা সাজানো রয়েছে। এসব অনেক অনেক কষ্টে অপলা করেছে তা বেশ ভালোই জানে ও। এই ঘরটার মধ্যে কেমন একটা মায়া, উষ্ণতা,  যেন সব কাজের শেষে এই ঘরটাতে ঢুকলেই মনটা শান্ত হয়ে আসে। ততক্ষণে নাড়ু, মিষ্টি চানাচুর সাজিয়ে মেঘলাকে ডাকে অপলা।  মেঝেতেই আসন পাতা। কাঁচের গ্লাসে জল।  জাঁকজমকহীন  ঘরোয়া পরিবেশ।
"চায়ের জলটা বসিয়ে দিই দাঁড়াও।"
"অপলাদি, তুমি খুব ভালো আছো,বলো?"
"জানিনা ভাই, তবে ভালো থাকার চেষ্টা করি। জানোই  তো কিরকম হিসেব করে চলতে হয় আমাকে। "
"তোমার সঙ্গে আর বোধহয় দেখা হবে না বুঝলে"
জিজ্ঞাসু চোখে তাকায় অপলা।
"এসব কী বলছো? কেন?"
"ঐ বাড়িতে আমার দমবন্ধ  হয়ে আসছে। এত এত জাঁকজমকের আড়ালে সব যেন কেমন প্রাণহীন। সুখ থাকলেও শান্তির বড় অভাব। এই যে তোমার এখানে কত শান্তি। তুমি বলেছিলে মানিয়ে নিতে। সে চেষ্টাও করছিলাম, কিন্তু মনটা বার বার বিদ্রোহ করছিল। জানোই তো, সকলের সাথে লড়া যায়, কিন্তু নিজের সাথে লড়াই বড্ড কঠিন। আর কতটাই বা কম্প্রোমাইজ  করে থাকা যায় তুমিই বলো? দিন দিন এটা সেটা নিয়ে খোঁটা দেওয়া বাড়ির সকলের। শুনেও না শোনার ভান করে আর কতদিন থাকা যায়? পারলাম না বুঝলে।  দিল্লিতে একটা ভালো কাজের অফার পেয়েছি, খুব তাড়াতাড়িই চলে যাবো ভেবেছি। হয়তো এই পুজোর শেষেই।"
তার পর আরোও কিছুক্ষণ কথা হলো, গল্প হলো।  কিন্তু এই মেঘলা যেন অন্য মেঘলা। আগের সেই উচ্ছল মেঘনা নয়।  শান্তশিষ্ট, বাস্তবতা বুঝতে শেখা মেঘলা। গৃহিনী ভাবটা এসে যাওয়াতে, উচ্ছল যুবতি ভাবটা উধাও হয়ে গেছে একেবারেই। এটা অপলার ভালো লাগল নাকি খারাপ, তা তার চোখ মুখ দেখে আজ বোঝা গেল না।
 যাওয়ার আগে গভীর আলিঙ্গনে বাঁধল।  বলল, "তুমি খুব ভাল থেকো অপাদি। তোমার সুখের সংসার  চিরজীবন অটুট থাকুক এই শুভক্ষণে এটুকুই কামনা করি।"
অপলা আর কিছু বলে উঠতে পারে না। চোখটা অজান্তেই ভিজে ওঠে। আর মেঘলার কাছে মনে মনে ক্ষমা ভিক্ষা করতে থাকে।