জীবন্ত স্মৃতি
রেশমিন খাতুন
আমাদের জীবনে ঘটে যাওয়া কিছু কিছু ঘটনা
থাকে যেগুলো মনে দাগ কেটে যায়। কিছু কিছু মুখ থাকে যেগুলো ভুলতে পারিনা কিছুতেই। আমাদের এদিকে ধান রোয়ানো বা ধান কাটার সময়ে বাইরে থেকে অনেক কৃষিশ্রমিক আসে। বিশেষত দুমকা-দেওঘর ও তার আশে পশের অঞ্চল থেকে আদিবাসী মহিলা ও পুরুষেরা সপরিবারে আসে। কয়েক বছর আগে এমনই কয়েকটা পরিবার এসেছিল আমারের গ্রামের মানুষদের ধান কাটতে। তাদের সাথে অনেকগুলো ফুলের মত ফুটফুটে বাচ্চা ছিল বছর পাঁচ-ছয়ের। কয়েকজনের সাথে আমি আলাপ করে বেশ ভালো ভাব জমিয়েছিলাম। ওদের সাথে রোজ বিকালে গল্প করতাম। আমার সাথে সকলে মিলে হাঁটতে যেত প্রায় প্রতিদিনই। ওদের মুখ থেকে ওদের গ্রামের গল্প শুনতাম। আমার খুব ভালো লাগত ওদের মুখের আধোআধো কথা গুলো শুনতে।
একদিন স্কুল থেকে ফেরার পথে ওদের কে চকোলেট এনে দিয়েছিলাম। এত্ত খুশি হয়েছিল, বলার বাইরে। সামান্য একটু জিনিষে ওদের খুশি আমাকে অনেক অনেক আনন্দ দিয়েছিল। তারপর থেকে ওরা আমার জন্য প্রতিদিন অপেক্ষা করত। আমাকে দেখে ওদের চোখে যে খুশির প্রতিচ্ছবি দেখতাম, তাতে ওই কটা টাকার বিনিমিয়ে অনেক বেশিকিছু ফেরত পেতাম। রোজকার ওদের এই খুশি দেখে আমার মন ভালো হয়ে যেত। তবে আমার জন্য ওরা অপেক্ষা করছে এটাও কখনো কখনো আমাকে বেশ অস্বস্তিতে ফেলত।
একদিন স্কুলের সহকর্মীর সাথে একটু ঝামেলা হওয়ায় মন মেজাজ বেশ খারাপ ছিল। সেসব নিয়ে ভাবতে গিয়ে চকোলেটের কথা ভুলে গেছিলাম। কিন্তু যথারীতি তারা আমার জন্য একই জায়গায় দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিল। স্কুলের ঝামেলা নিয়ে মন খারাপের কারণে সেদিন একটু খারাপ ভাবেই ওদের কে বকে দিলাম। বললাম, "রোজ রোজ তোরা আমাকে এভাবে ঝেঁপে ধরছিস কেন? আজ আমার চকোলেট আনতে মনে নেই। কাল দেব, যা তোরা আজ"। ওরা আমার এমন রাগী রূপ দেখে বেশ দুঃখ পেল, কিন্তু মুখে কিছু না বলেই ফেরত গেল। বাড়ি আসার পর আমার ব্যবহারের জন্য ওদের ছলছল চোখ আর দূঃখি মুখ গুলো বারবার মনে পড়তে লাগল। তখন আর অন্য কোনো উপায় ও ছিল না। তাই মনস্থির করলাম পরের দিন ওদের জন্য চকোলেট ছাড়াও আরোও অনেক কিছু আনব। পরের দিন সেই মত চকোলেট ছাড়া কিছু খেলনা কিনে নিয়ে এসেছিলাম ব্যাগে। কিন্তু সে জায়গাতে কেউ ছিল না।।ভাবলাম হয়তো কালকের ব্যবহারের জন্য ওরা আমার কাছে আসতে ভয় পাচ্ছে। নামধরে আওয়াজ দিলাম, কিন্তু কোনও সারা পেলাম না। যাদের বাড়িতে কাজে এসেছিল, তাকে জিজ্ঞেস করলাম ওই কাজের লোক গুলো কোথায়? জানতে পারলাম, তাদের জমির কাজ কাল শেষ হয়ে গেছে তাই আজ ওরা সকলেই নিজের নিজের দেশের বাড়ি ফিরে গেছে। সে কথাটা শুনে বেশ খারাপ লাগল আমার।
প্রত্যেক বারের মত এবারেও অনেক আদিবাসী কৃষিশ্রমিক এসেছিল আমাদের গ্রামে, কিন্তু আমি সেইসব ছেলেদের একজনকেও আর কখনোও দেখতে পাইনি। জানিও না আর কখনোও তাদের কারুর সাথে সাক্ষাৎ হবে কিনা, বা সাক্ষাৎ হলেও তাদের কে চিনতে পারব কি না। তাদের সেইসব মলিন মুখিগুলো এখনোও মনে পড়লে আমার ভীষন ভীষন কষ্ট হয়।

Comments