তরমুজ রাঙা দেওয়াল
রেশমিন খাতুন
অনিমার সঙ্গে দেখা হলো হঠাৎই। বাস ধরব বলে দাঁড়িয়ে আছি এবং এই বাসের জন্য অপেক্ষা করাটা পৃথিবীর বিরক্তিকর কাজ মনে হয়। পাঁচটা মিনিট সময় ও যেন অচল হয়ে থাকে। বাস ঢুকছে, পলকে চলমান হচ্ছে, হুস করে অন্যরুটের যাত্রীদের নিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। খয়েরি ব্লাউজ, সবুজ সাদায় মেশানো শাড়ি, আঁট করে খোঁপা। অনিমাকে চিনতে সময় লাগল না। মুখটা ঘামে ভিজে গেছে। বেশ রোগা হয়ে গেছে।
"অনিমা"
"দিদি, তুমি ভালো আছো? এদিকে কোথায়?"
"যাবো একটু আট ঘড়া। কেমন আছিস?"
"ভালোই" হেসে উত্তির দিলো অনিমা। হাসিটার মধ্যে আগের উচ্ছলতা না থাকলেও প্রাণ ছিল।
"খুব রোগা হয়ে গেছিস।"
"আর বলেন না, সংসারের যত কাজ, নিজের কাজ তার উপর ছেলে সামলানো"
"শ্বশুরবাড়িতে আছিস তো?"
"হ্যাঁ, ওখানেই আছি।"
মুখটা বিকৃত করল।
কথায় কথায় শ্বশুরবাড়ির অশান্তির কথা, কলোনিতে জমি কেনার কথা বলল।
"তাই নাকি! ওখানে তো জমির এখন অনেক দাম।"
"আমার গয়নাগুলো বন্ধক দিয়ে, লোন নিতে হয়েছে। এখন ওর আর আমার মাইনের বেশিরভাগ টাকাটাই লোন শোধ করতেই যাবে।"
অনিমার বাস আসতে সে বিদায় নিলো। সারাদিন অনিমার চিন্তা ঘুরে ফিরে আসছিল। স্মৃতিই এরকম। চাপা পড়ে থাকে, তখন থাকে। আবার যখন ছিপি খুলে যায় তখন হুস হুস করে সমস্ত বেরিয়ে এসে ভাসিয়ে নিয়ে যায়।।
বছর চারেকের ছোটো হবে অনিমা আমার চেয়ে। টিউশন ব্যাচের সেই ফুটফুটে কিশোরি আজ পোড় খাওয়া সংসারী। ভবিষ্যত নিয়ে ভাবিত একজন মা। মাধ্যমিকের অঙ্কের ব্যাচে ও ছিল দলছুট। কথার খই ফুটত সর্বক্ষণ। আমরা ওকে নিয়ে মজা করতাম। ও তাতে কোনোও দিন দমত না। রাখীবন্ধনের দিনে একগাদা রাখী এনে সবার হাতে বাঁধত, আর ওর হাত ভরে উঠত চকোলেটে।
বছর তিনেক পরে অনিমার সঙ্গে আবার দেখা হলো রাস্তাতেই। আরো শীর্ন এবং বয়স্ক দেখাচ্ছে। কলোনিতে বাড়ি প্রায় শেষের মুখে, এই খবরটা পেয়ে খুব আনন্দিত হলাম।
"যাক, এবার তোর কষ্ট যাবে"
"হ্যাঁ দিদি, কষ্ট বলে কষ্ট। সেই কোন ভোরে উনুনে আঁচ, সংসারের সব কাজ, ছেলেটা পিছন পিছন ঘোরে। একবার কোলেও করতে পাই না। তারপর আমাদের কাজের ও খুব চাপ। বাড়ি গিয়েই আবার উনুনের সামনে বসা।"
"তোর শরীর কিন্তু খুব ভেঙে গেছে। শরীরের দিকে নজর দে।"
"আর শরীর! কী কষ্ট করে চালাচ্ছি। সামান্য হাত খরচটুকুও বাঁচিয়ে রাখি। এই কয়েক বছর একটু ভালো খাওয়া না, একটা ভালো শাড়ি না, কিচ্ছু না। মাস তিনেকের মধ্যে ও নরক ছাড়ছি, তারপর বাকি জীবনটা তো রইল সাধ আহ্লাদের জন্য। "
"ইচ্ছে রইল তোর নতুন সংসার দেখার।"
"হ্যাঁ দিদি, যাবেন। ঘরের ভিতরটা তরমুজের গায়ের মত রং করিয়েছি।"
"ভালোলাগবে?"
"ও বলছিল একটু পুরাতন হয়ে গেলে কালচে লাগবে। "
"ঠিক আছে, একদিন গিয়ে দেখে আসব"
দ্বিতীয়বার ওর সঙ্গে দেখা হওয়ার পর বেশ দীর্ঘদিন কেটে গেছে। এতদিন হয়তো নতুন সংসার গুছিয়ে ঘর করছে। যাবো যাবো করেও যাওয়া হয়নি এখনো পর্যন্ত ওর তরমুজরঙা দেওয়াল দেখতে।
আমার এক আত্মীয় অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি ছিল, তাকে দেখতে গিয়েছিলাম। অনেকটা সুস্থ দেখে আশ্বস্ত হলাম। এখান থেকে কলোনি বেশী দূর হবে না। শহরের লাগোয়া তবে এখনো বেশ ফাঁকা ফাঁকা আছে। ওর স্বামীর নাম।বলতে পাড়ায় একজন দেখিয়ে দিলো বাড়িটা। সামনে রেলিং দেওয়া বারান্দা কলিং বেল বাজার কিছুক্ষণ পরেই দরজাটা খুলল একটা ২৬-২৭ সুশ্রী স্বাস্থ্যবতী মেয়ে। একটু থমকে গেলাম। ঠিক বাড়িতে এলাম তো?
"এটা কি সুবীর মন্ডলের বাড়ি?"
"হ্যাঁ, আসুন।"
বেশ সাজানো একটা ছোট্ট ঘরে মেয়েটি বসালো আমাকে।
অনিমা কোথায়? মেয়েটাই বা কে? কোনোও আত্মীয়া?
কিছুক্ষণ পর মেয়েটি শরবৎ নিয়ে ফিরল। সত্যি প্রচন্ড তেষ্টা পেয়েছিল। এক নিশ্বাসে শরবতটা শেষ করলাম।
"অনিমা নেই? ওর হাজবেন্ড আছে?"
মেয়েটি একটু অবাক হলো।
"আপনি জানেন না?"
"কী জানব?"
"অনিমা, মানে অনিমা দি তো একটা রোড অ্যাক্সিডেন্টে...."
পায়ের তলা থেকে মাটিটা কেমন যেন কেঁপে উঠল। নিজের অজান্তেই উঠে দাঁড়ালাম।
"কবে হলো?"
গলাটা তীক্ষ্ণ শোনালো।
"গত বছর কালী পুজার সময়।"
"তুমি কে?"
এবার মেয়েটি একটু লজ্জা পেলো।
"আমি ওনার দ্বিতীয় পক্ষ"
এবার ও আমার আমূল চমকে ওঠার পালা। মেয়েটার দিকে আর তাকাতে ইচ্ছে করছিল না। ঘৃণায়, বিদ্রুপে শুধু বলতে ইচ্ছে করছিল, "শাবাশ"। কিন্তু একে বলে কী লাভ?
বারবার শুধু চোখ চলে যাচ্ছিল তরমুজ রঙের দেওয়ালটার উপরে। যার ভিতরে লুকিয়ে আছে সেই হতভাগিনীর অনেক অনেক রক্ত।
