শেষ হবার পর
রেশমিন খাতুন
অনেকদিন পর অদ্রিজা প্রান ভরে খোলা আকাশের নীচে দাঁড়িয়ে মনে মনে বলল 'সত্যিই হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম'। এমন একটা রিলেশন যেন তাকে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরছিল। আর কিছুদিন এই রিলেশনে থাকলে সত্যিই দম বন্ধ হয়ে মারা যেত। কুণাল কে কি সত্যিই সে ভালোবাসে? তাহলে আজ সম্পর্ক থেকে মুক্ত হতে পেরে এত ভালো লাগছে কেন? তবে কুণাল একটা 'মানসিক রোগী', ওর সাথে থাকলে হয়তো ও নিজেও কবে ওর মতই হয়ে উঠত। কিভাবে অদ্রিজা কুণালের প্রতি এতটা দুর্বল হয়ে পড়েছিল কে জানে। তবে ওই যে, মেয়েরা 'ইমোশনাল ফুল' হয়, হয়তো সেটাই কাল হলো। দুনিয়াশুদ্ধ সকলকে বিশ্বাস করে ফেলে, সকলকেই ভাল ভেবে আন্তরিক হয়ে পড়ে। বাল্যবন্ধু অনিকা ওকে বার বার বলে, "এবার তুই তোর স্বপ্নের জগৎ থেকে বাস্তবে পা রাখ অদ্রি" কিন্তু তার এসব কথা কানে তুলতে বয়েই গেছে। কুণাল কে তো ও ভীষণ বিশ্বাস করে। কিন্তু এত সন্দেহ কেন কুণালের সেটাই বুঝতে পারে না। হ্যাঁ, রিলেশনে একটু আধটু সন্দেহ থাকা ভালো,তাই বলে এত! কুণালের ভয়েই ফেসবুকে কোনোও ছবি বা কবিতা বা গল্প পোস্ট করাই বন্ধ করে দিয়েছিল। পোস্ট করলেই বন্ধুদের কেউ না কেউ প্রশংসা করতো, আর ফের ঝামেলা শুরু। হোয়াটসঅ্যাপ স্ট্যাটাসে ছবি আপলোড করলেও কুণাল কে হাইড করে দিত ঝামেলা এড়ানোর জন্য। তাহলে কি ও কুণাল কে ভয় পেতে শুরু করেছিল? কুণাল কেন এগুলো পছন্দ করত না? রোজ রোজ এই নিয়ে কত যে ঝগড়া। শেষ দিকে এমন ঝগড়া হতো যে ফোন সুইচঅফ ও করে দিতো। সে বুঝতে পারে, প্রথম প্রথম কুণালের কেয়ার করা দেখে ওর প্রতি দুর্বল হয়ে পড়েছিল। তাহলে কী...কে জানে। ধুর! ওর কথা কেন ভাবছে।
এই তো একা থাকার বেশ একটা আলাদা আমেজ আছে। কারুর প্রতি কোনোও দায় থাকে না। ইচ্ছে মত চলা যায়, নিজের মত করে ঘুমানো যায়,ওঠা যায়। সে তো আগে কোনোওদিন বেশী রাত জাগতে পারত না। কিন্তু জীবনে কুণাল আসার পর সে নিয়ম বদল হলো। প্রায়দিন মাঝ রাত গড়িয়ে যেত কুণালের সঙ্গে কথা বলতে বলতে যার ফলে সকালের উঠতে দেরী, অফিসে যেতে দেরী। আর এই নিয়ে বাড়িতে মায়ের কাছে, অফিসে সিনিয়রের কাছে কতশত কথা শুনতে হত।
"কী রে কী এত ভাবছিস?" অনিকার ডাকে স্মৃতির জগৎ থেকে বাস্তবে ফিরে আসে অদ্রি।
" কই, কিছুনা তো। বল।"
"শোন না, আজ একটু কেনাকাটা করতে যাই চল। তোর তো চয়েস খুব সুন্দর, আমাকে কিছু জিনিষ দেখে শুনে পছন্দ করে দিবি।"
"হুম, চল যাওয়া যাক। আমিও কিছু জিনিষ কেনাকাটি করব ভাবছিলাম। স্যার কে বলে আজ না হয় একটু আগেই বেরিয়ে যাবো।"
বেশ কিছুদিন পর দুই বন্ধু মিলে মনের মত কেনাকাটা করল। ফুচকা, চিকেন রোল, আইসক্রিম, চাট সহযোগে বেশ জম্পেশ করে খাওয়া দাওয়াও করল দুজনে।
"কীরে অদ্রি, তুই না ডায়েট করছিলি। আজ হঠাৎ এমন দিলদরিয়া হয়ে খেয়ে নিলি যে?"
"সে তো গত এক বছর ধরেই করছিলাম ওই গাধাটার জন্য। বারবার বলত 'তোমাকে একটু Slim হলে আরোও ভালো দেখাবে' ।" মুখ বাঁকায় অদ্রি।
"হুম তো।।কুনাল ঠিকই বলেছে তো। এতে মুখ বাঁকানোর কী হল?"
"ছাড় তো। তুই ভালোই জানিস, আমার মন যা চাই আমি তাই করি। তুই বল তোর প্রীতমের কী খবর? আজীবন প্রেমই করে যাবি, নাকি ছাঁদনা তলা অব্দি যাবি?"
"হ্যাঁ রে, বিয়ে তো করবই। ও আর একটু থিতু হয়ে নিক তারপর"
বাড়ি ফিরতে ফিরতে বেশ খানিকটা রাত হয়ে গেছিল। অদ্রি জানে, মা এই রাত করে বাড়ি ফেরা মোটেই পছন্দ করেন না। তবে আজ হাতে কেনাকাটার ব্যাগ গুলো দেখে তেমন কিছু বললেন না। নিজের রুমে আসার সময় মায়ের গলা কানে এলো,
"অদ্রিজা, খাওয়া দাওয়ার পরে একটু আমার ঘরে আসবি। "
উফ,আজ ফের হয়তো বিয়ের কথা বলবে। এই এক কথা শুনতে শুনতে মাথা খারাপ হয়ে যাবে। খাওয়া দাওয়া হয়ে গেলেও, একটু দেরী করেই মায়ের ঘরে যায় অদ্রি। গিয়ে মায়ের পাশে বসে।
"বলছি, কুণালের কথা ভেবে কি আর তুই বিয়ে করবি না?"
অদ্রি উত্তরে কিছু বলে না। মাথাটা নীচু করে খাটের পায়ার মাথাটা আঙুল দিয়ে খুঁটতে থাকে।
"তোর রাঙা মাসি বিয়ের জন্য একটা পাত্র দেখেছে। ওদের কে তোর ছবি দেখিয়েছে। তাদের পছন্দ হয়েছে।"
অদ্রি ভাবে, মরতে কেন যে মাকে হোয়াটসঅ্যাপ করা শেখালো। এখন দিন গেলেই একে তাকে বিয়ের জন্য ছবি পাঠিয়েই যাচ্ছে। অদ্রি শুধু একবার মুখ তুকে দেখে ফের খাটের পায়া খুঁটতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। অদ্রির মা মালা দেবী উত্তরের অপেক্ষা না করে ফের বলেন, "তারা আসতে চায় তোকে দেখতে। তাই তোর মতামত টা জানতেই তোকে ডাকলাম"
অদ্রি এতক্ষণে উত্তর দেয়, "মা তোমাকে তো বলেছি, আর একট সময় দাও আমাকে। তারপর নাহয় আমি ..."
মালাদেবী মেয়েকে মাঝ পথেই থামিয়ে দিয়ে বলে ওঠেন, "না অনেক টা সময় দিয়েছি তোকে, আর না। আমার বয়স হচ্ছে, কবে কী হয়ে যায় তার ঠিক নেই"
ধুর, ফের সেই ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইল করা শুরু করল মা। একটু জোরে খাটের পায়াটা খুঁটে ছিল মনে হয়। নখে ব্যথা পেয়ে থেমে গেল।
"তার আসতে চায় আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই। দিন ঠিক হলে তোকে জানাবো। মনে করে সেদিন অফিস ছুটি নিয়ে নিস।"
"মা..."
"ব্যস, আমি আর কিছু শুনতে চায় না। আজ অনেক রাত হলো, এবার ঘুমাতে যা। আর হ্যাঁ, ফোন ঘাঁটিস না। সোজা লাইট অফ করে ঘুমিয়ে পড়বি।"
উফফফ! মা কী ভাবে আমি এখনও সেই ছোট্ট মেয়েটিই আছি? মা কেন বোঝেনা, এখন আমি প্রাপ্তবয়স্ক একজন মানুষ। সব মায়েরাই কী এমন হয়? তর্জনীটাকে ভালো ভাবে দেখতে দেখতে মায়ের ঘর থেকে বেরিয়ে আসে অদ্রি।
"কেন আজ এত কুণালের কথা মনে পড়ছে? গাধাটা তো সবই জানত। আমি তো তার প্রতি দুর্বল, তবুও কেন এমন করল?" মনে মনে বিড়িবিড় করে বারান্দা পার হয়ে নিজের ঘরে ঢোকে। ভগবান যা করে ভালোর জন্যই করে। অনিকা ঠিকই বলে, সে সত্যিকারেই এখনও মানুষ চিনতে পারেনা।
সকালে একটা অচেনা নাম্বার থেকে কল এলো। রিসিভ করবে না ভেবেও রিসিভ করল অদ্রি।
"হ্যালো, কে বলছেন?"
"আমি অর্ক। মানে রাঙা পিসি আমাকে আপনার নাম্বার টা..."
"হ্যাঁ, দাঁড়ান মাকে দিচ্ছি ফোনটা"
"না না, আমি আপনার সাথে কথা বলার জন্যই কল করেছিলাম। এত সকালে কল করে কি আপনাকে বিরক্ত করলাম?"
"না না তেমন কিছু না। বলুন কী বলবেন।"
অদ্রি মনে মনে অবশ্য বলে ওঠে, বিরক্ত আবার করেন নি, । কিন্তু সেটা বলে উঠতে পারে নি।
"তেমন কিছু না। একবার কী আপনার সাথে সাক্ষাৎ হতে পারে? আপনার অফিসের ওখানের কফিশপেই নাহয় এক কাপ কফি খেলেন আমার সাথে।"
" আপনার সাথে কফি খাবো? কেন বলুন তো?"
"আসলে রাঙা পিসি বলছিলেন, আপনি তো বিয়েতে রাজি হননি। সেটা মাথায় রেখেই নাহয় এই অধমের সাথে অল্প কিছু সময় কাটালেন।"
"আরে এসব কী বলছেন। যখন বিয়ের কথা এগোচ্ছেই না, তবে ফের সাক্ষাত কেন?"
"যাকে বাতিল বলে
দিলেন, তাকে একবার চোখের দেখা দেখবেন না? তার সাথে একটু কথা বলার প্রয়োজন ও মনে করছেন না?"
"আচ্ছা ঠিক আছে, তাহলে আগামী মঙ্গলবার অফিসের শেষেই পাঁচটার সময় নাহয় কফিশপে যাবো আপনার সাথে এককাপ কফি খেতে।"
"ধন্যবাদ। বাকি কথা নাহয় সাক্ষাতেই হবে। আপাতত বাই" বলে ফোন কেটে দিলো অর্ক। অদ্রিজা ভাবতে বসল সে ঠিল করল নাকি ভুল। সাথে রাঙা পিসিকে মনে মনে কয়েক প্রস্ত গাল পেড়ে ক্ষান্ত হলো। কী দরকার ছিল এসব বলার। জানেনা, তার ব্যাপারে কী কী ভেবে বসে আছে ভদ্রলোক। এখন আবার তার সামনে গিয়ে বসতে হবে ভাবতেই রাঙা পিসির উপর রাগে গা রিরি করে উঠছে।
নির্দিষ্ট দিনে অদ্রি একটা নীল শাড়ি পরে অফিসে গেল। কেন পরল সেটার নির্দিষ্ট কারণ ও জানে না। অফিস শেষে কফিশপে গিয়ে দেখল ওর আগেই অর্ক পৌঁছে গেছে অর্ক। সাদা জামা, ব্লু জিন্স, চোখে সানগ্লাসে বেশ হ্যান্ডসাম লাগছিল অর্ককে। অর্ক তাকে দেখে চশমাটা খুলে এগিয়ে এলো তার দিকে।।
"আসুন আসুন অদ্রিজা দেবী।"
"বাব্বাহ, আবার 'দেবী'কেন?"
"কারণ আপনার চোখ জোড়া অনেকটা মা দুর্গার মত টানা টানা। তাই"
"হয়েছে মশাই। ধন্যবাদ"
"তাছাড়া আপনার ছবির থেকেও আপনি অনেক বেশী সুন্দরী"
"থাক থাক। আমি জানি আমি কেমন। এত ফ্লার্ট না করলেও চলবে।"
"আসুন বসা যাক। দিয়ে কথা বলি।"
"হ্যাঁ, চলুন।" বলে দুজনে দুটো চেয়ারে মুখোমুখি বসে দুই কাপ কফির অর্ডার দিলো।
"তো অদ্রিজা দেবী আপনি কেন বিয়ে করতে চান না? আমি কি এতটাই অযোগ্য?"
"না ঠিক তা নয়। মানে আর একটু সময় চেয়েছিলাম আমি নিজেকে গুছিয়ে নিতে।"
"হুম বুঝলাম। তা সেটুকু সময় কি আমি দিতাম না আপনাকে? কি মনে হয়?"
অদ্রিজা উত্তর দিলনা অর্কের প্রশ্নের। উল্টে অর্ককেই প্রশ্ন করল, "আচ্ছা আপনারই বা আমার প্রতি এত আগ্রহ কেন?"
"না মানে আপনার ছবি দেখেই আপনার প্রেমে পড়ে গেছি। তাই ভাবলাম অন্তত একটিবার তো সাক্ষাত করে চোখের দেখা দেখি আপনাকে।"
"বাহ, বেশ ভালো সাজিয়ে গুছিয়ে কথা বলেন তো আপনি। তা এভাবে কতজনের ছবি দেখে প্রেমে পড়েছেন?"
"বিশ্বাস করুন, অফিসের কাজের যা চাপ তাতে অন্য কোনোও দিকে মনযোগ দেওয়ার সময় হয়ে ওঠেনি। সেজন্যই বিয়ের পুরো দায়িত্বটা বাড়ির লোকজনের উপরেই ছেড়ে দিয়েছিলাম। পরে রাঙা পিসির মাধ্যমেই আপনার খোঁজ পেলাম। তারপর থেকে আপনার ছবি দেখে কী যে হলো। সেজন্যই আপনি রিজেক্ট করার পরেও আগবাড়িয়ে ফোনটা করেই ফেললাম।"
সেদিন কফিশপে অদ্রিজার খারাপ লাগেনি অর্ককে। বেশ প্রাণোচ্ছল মানুষ। কেমন সব গড়গড় করে বলে যায়। সময়টুকু বেশ ভালোই কেটে ছিল। পরদিন অনিকাকে কথাটা বলতেই অনিকা বেশ ভালোই খোঁচা দিতে শুরু করল।
"বাব্বাহ, একেবারে কফিশপ...তারপর.. আর কী কী..."
"চুপ কর তো তুই। আর কিছুই না। "
"তো কাকীমাকে বলেছিস এ ব্যাপারে?"
"না বলিনি। কিছুদিন যাক তারপর নাহয় জানাবো।"
"বেশ তাই করিস।"
সেদিন রাত্তিরে ফের অর্কর ফোন এলো। 'তো অদ্রিজা দেবী আমাকে কেমন লাগল সেটা তো এখনও জানালেন না?"
"হুম। ভালোই। ভাবছি এরকম একটা গাধা আমার দরকার..."
"গাধা কেন, চাইলে আপনার জন্য আমি গরু, ছাগল, হনু সব হতে রাজি।"
এভাবেই টুকটুক করে কথা চলতে থাকল। আর অনেক অনেক দিন পর মনখারাপের মেঘটা কেটে ভালোলাগাটা ফিরে আসতে শুরু করল।

Comments