সম্পাদকীয়
কর্পোরেট স্বার্থের রাষ্ট্র, নাকি জনগণের গণতন্ত্র?
ভারতের অর্থনীতির বর্তমান বাস্তবতা নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে একটি প্রশ্ন ক্রমশ জোরালো হচ্ছে—রাষ্ট্র কি জনগণের কল্যাণের জন্য পরিচালিত হচ্ছে, নাকি বৃহৎ কর্পোরেট গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষাই আজ সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার?
গত এক দশকে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির নানা পরিসংখ্যান তুলে ধরা হলেও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় লাগামহীনভাবে বেড়েছে। ওষুধ, জ্বালানি তেল, রান্নার গ্যাস, বিদ্যুৎ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার খরচ প্রতিনিয়ত বৃদ্ধি পাচ্ছে। অথচ একই সময়ে কৃষক তার উৎপাদিত ফসলের ন্যায্য মূল্য পাচ্ছেন না, শ্রমিকের প্রকৃত মজুরি মূল্যস্ফীতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাড়ছে না, এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা বাজারে টিকে থাকার জন্য সংগ্রাম করছেন।
জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ে সাধারণ মানুষের উপর। পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি পেলে খাদ্যদ্রব্য থেকে শুরু করে প্রায় সব পণ্যের দাম বেড়ে যায়। আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম কমলেও দেশের খুচরা বাজারে তার পূর্ণ সুফল সাধারণ মানুষ অনেক সময় পান না। এর ফলে জনগণের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে—এই মূল্যবৃদ্ধির প্রকৃত সুবিধাভোগী কারা?
ওষুধের ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা যায়। চিকিৎসা ব্যয় আজ বহু পরিবারের জন্য এক ভয়াবহ আর্থিক বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। জীবনরক্ষাকারী ওষুধের দাম বৃদ্ধি এবং বেসরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ক্রমবর্ধমান খরচ সাধারণ মানুষকে আরও অসহায় করে তুলছে।
অন্যদিকে কৃষকরা উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি, সার-বীজ-জ্বালানির দাম বৃদ্ধি এবং বাজারে ন্যায্য মূল্য না পাওয়ার কারণে সংকটে রয়েছেন। কৃষিপণ্যের দাম অনেক সময় এমন পর্যায়ে নেমে আসে যে কৃষক উৎপাদন খরচও তুলতে পারেন না। একদিকে ভোক্তা উচ্চমূল্য দিচ্ছেন, অন্যদিকে উৎপাদক কম দাম পাচ্ছেন—এই বৈপরীত্য বাজার ব্যবস্থার গভীর অসঙ্গতির দিকেই ইঙ্গিত করে।
সমালোচকদের মতে, অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারণে বৃহৎ কর্পোরেট সংস্থাগুলির প্রভাব ক্রমশ বৃদ্ধি পেয়েছে। কর ছাড়, জমি বরাদ্দ, বেসরকারিকরণ এবং নীতি প্রণয়নের ক্ষেত্রে কর্পোরেট স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার অভিযোগ বারবার উঠেছে। তবে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়, শিল্প ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে এবং দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিকে শক্তিশালী করে।
প্রকৃত প্রশ্ন হলো—উন্নয়নের সুফল কি সমাজের সর্বস্তরে পৌঁছাচ্ছে? যদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সত্ত্বেও কৃষক ঋণগ্রস্ত থাকেন, শ্রমিকের আয় কমে যায় এবং মধ্যবিত্তের সঞ্চয় ক্ষয় হতে থাকে, তবে সেই উন্নয়নের প্রকৃত অর্থ কী?
একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের দায়িত্ব কেবল বৃহৎ বিনিয়োগ আকর্ষণ করা নয়; একইসঙ্গে কৃষক, শ্রমিক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও সাধারণ নাগরিকের জীবনমান উন্নত করাও তার সাংবিধানিক ও নৈতিক দায়িত্ব। রাষ্ট্র যদি জনগণের পরিবর্তে ক্রমশ পুঁজির প্রতি বেশি দায়বদ্ধ হয়ে ওঠে, তবে গণতন্ত্রের মৌলিক ভারসাম্য ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
আজ প্রয়োজন এমন অর্থনৈতিক নীতি, যা কর্পোরেট বিনিয়োগ ও শিল্পোন্নয়নের পাশাপাশি কৃষকের ন্যায্য মূল্য, শ্রমিকের মর্যাদাপূর্ণ মজুরি, সুলভ স্বাস্থ্যসেবা এবং সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধিকে সমান গুরুত্ব দেয়। কারণ একটি দেশের শক্তি কেবল তার কর্পোরেট মুনাফায় নয়, বরং তার সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মানেই প্রতিফলিত হয়।
গণতন্ত্রের প্রকৃত সাফল্য তখনই, যখন রাষ্ট্রের নীতির কেন্দ্রে থাকে জনগণ—কর্পোরেট মুনাফা নয়।

0 Comments