Ticker

6/recent/ticker-posts

সম্পাদকীয়: আইনের শাসন কি বুলডোজারের চাকার নিচে?

 


সম্পাদকীয়: আইনের শাসন কি বুলডোজারের চাকার নিচে?

সহারানপুরের জেলা প্রশাসকের দফতর চত্বরে একটি মসজিদ ভেঙে ফেলার ঘটনা নিছক একটি স্থাপনা অপসারণের ঘটনা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি একসঙ্গে আইনের শাসন, প্রশাসনিক ক্ষমতার সীমা, ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং বিচারপ্রক্রিয়ার ন্যায্যতা—এই চারটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনে দিয়েছে।

সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে জানা যাচ্ছে, সহারানপুর কালেক্টরেট চত্বরে থাকা মসজিদটিকে সরকারি জমিতে অননুমোদিত নির্মাণ হিসেবে চিহ্নিত করে জুলাই মাসে উচ্ছেদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। মসজিদ পরিচালনাকারী পক্ষ সেই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করেছিল; ২ সেপ্টেম্বর আপিল খারিজ হওয়ার পর ৫ সেপ্টেম্বর মসজিদটি ভেঙে ফেলা হয়। প্রশাসনের বক্তব্য—আইনি প্রক্রিয়া মেনেই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে মসজিদ কর্তৃপক্ষের অভিযোগ—ধ্বংসের জন্য পৃথক আদেশ ছাড়াই এবং যথাযথ প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হওয়ার আগেই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

এখানেই মূল প্রশ্ন।

কোনও ধর্মীয় স্থাপনা সত্যিই সরকারি জমিতে বেআইনিভাবে নির্মিত হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে—এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সেই আইন যেন সবার জন্য সমান হয়, সেটিই গণতন্ত্রের আসল পরীক্ষা।

ছবিতে ১৯৯১ সালের নির্মাণ, ইয়াকুব খান ও ওয়াহিদ খানের মালিকানা এবং পরবর্তীতে প্রশাসনিক কাজে জমি ব্যবহারের মতো কিছু দাবি করা হয়েছে। এসব দাবির প্রত্যেকটির সত্যতা সরকারি নথি ও আদালতের রায়ের ভিত্তিতে আলাদাভাবে যাচাই করা জরুরি। কারণ আবেগপ্রবণ রাজনৈতিক পোস্টকে প্রমাণ হিসেবে গ্রহণ করা যেমন বিপজ্জনক, তেমনই প্রশাসনের বক্তব্যকে প্রশ্নাতীত ধরে নেওয়াও গণতান্ত্রিক সমাজের জন্য স্বাস্থ্যকর নয়।

আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়—মসজিদটি কত বছরের পুরোনো, তার থেকেও গুরুত্বপূর্ণ হলো জমিটির প্রকৃত মালিকানা কী, কোন নথি প্রযোজ্য, নির্মাণের অনুমতি ছিল কি না এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষকে পূর্ণ আইনি প্রতিকার পাওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল কি না।

বর্তমান বিতর্ক আরও গভীর হয়েছে, কারণ ধ্বংসস্তূপের নিচে প্রায় ২০ ফুট গভীর একটি পুরনো কূপ পাওয়া গেছে এবং প্রত্নতাত্ত্বিক বিশেষজ্ঞরা সেটি পরীক্ষা করছেন।

এই ঘটনা প্রশাসনের জন্যও একটি কঠিন প্রশ্ন রেখে যাচ্ছে:

যদি কোনও স্থাপনা অবৈধ হয়, তবে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে এত তাড়াহুড়োর প্রয়োজন কেন?
বিশেষ করে যখন তার ইতিহাস, জমির মালিকানা এবং ধর্মীয় মর্যাদা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে, তখন প্রতিটি নথি প্রকাশ্যে এনে, সংশ্লিষ্ট পক্ষকে পর্যাপ্ত আইনি সুযোগ দিয়ে, আদালতের নির্দেশের সম্পূর্ণ স্বচ্ছ বাস্তবায়নই হওয়া উচিত ছিল।

কারণ বুলডোজার কখনও আদালতের বিকল্প হতে পারে না।

রাষ্ট্রের শক্তি তার বুলডোজারে নয়—তার আইনের প্রতি আনুগত্যে। একটি মসজিদ হোক, মন্দির হোক, গির্জা হোক কিংবা অন্য কোনও ধর্মীয় স্থাপনা—অবৈধ হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। কিন্তু একই সঙ্গে বৈধ হলে তাকে রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক ক্ষমতার জোরে স্পর্শ করার অধিকার কারও নেই।

আর একটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ধর্মীয় স্থাপনা নিয়ে বিরোধকে যদি রাজনৈতিক মেরুকরণের হাতিয়ার বানানো হয়, তাহলে ক্ষতি শুধু একটি সম্প্রদায়ের নয়—ক্ষতি হয় রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলির প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থার

আজ যদি কোনও নাগরিকের মনে প্রশ্ন জাগে—“আমার ধর্মীয় স্থাপনার ক্ষেত্রেও কি একই আইন, একই প্রক্রিয়া, একই আদালত এবং একই মানদণ্ড প্রয়োগ হবে?”—তাহলে সেই প্রশ্নের উত্তর প্রশাসনকে কথায় নয়, কাজে দিতে হবে।

সহারানপুরের ঘটনায় তাই দাবি হওয়া উচিত—
সমস্ত জমির রেকর্ড প্রকাশ করা হোক। আদালতের সংশ্লিষ্ট আদেশগুলি জনসমক্ষে আনা হোক। মসজিদ পরিচালনাকারী পক্ষের নথিগুলি পরীক্ষা করা হোক। প্রশাসনের প্রতিটি পদক্ষেপের বৈধতা নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা হোক।

কারণ গণতন্ত্রে কোনও পক্ষের জন্য বিশেষ সুবিধা যেমন কাম্য নয়, তেমনই কোনও পক্ষের জন্য বিশেষ কঠোরতাও গ্রহণযোগ্য নয়।

মসজিদ ভাঙা হয়েছে কি না—এটি একটি ঘটনা। কিন্তু তার থেকেও বড় প্রশ্ন হলো, ভাঙার আগে ও পরে আইনের প্রতিটি ধাপ মানা হয়েছে কি না।

রাষ্ট্র যদি সত্যিই আইনের শাসনে বিশ্বাস করে, তবে তার প্রমাণ দিতে হবে স্বচ্ছতা, ন্যায়বিচার ও সমতার মাধ্যমে—বুলডোজারের গর্জনে নয়।

Post a Comment

0 Comments